কারাগারের ভেতর থেকেই সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন লরেন্স বিষ্ণোই

বলিউড তারকাকে হুমকি, কানাডায় সন্ত্রাসী তালিকায়—এক গ্যাং লিডারের অন্ধকার সাম্রাজ্য

ভারতের গুজরাটের উচ্চ নিরাপত্তার সবরমতী কারাগার—এই ছোট্ট সেলটাই এখন লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সাম্রাজ্যের সদর দপ্তর। অভিযোগ, এখান থেকেই তিনি পরিচালনা করছেন ভারতের অন্যতম ভয়ংকর গ্যাং। হাতে শুধু একটি স্মার্টফোন, যা গোপনে জেলের ভেতর পাচার হয়ে এসেছে। আর সেটিই তাঁর ‘রাজদণ্ড’, সেলের কংক্রিটের বাক্সই যেন ‘রাজসিংহাসন’।

৩২ বছর বয়সী এই গ্যাং লিডারের বিরুদ্ধে অভিযোগ—কারাগারের ভেতর থেকেই তিনি বলিউড সুপারস্টার সালমান খানকে হুমকি, পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালাকে হত্যা, এমনকি বিদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছেন।


কারাগারের ভেতরেই ভয়ংকর নেটওয়ার্ক

ভারতের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) অভিযোগ করেছে, বিষ্ণোই কারাগারের ভেতর থেকেই ৭০০ জনেরও বেশি সদস্যের একটি সন্ত্রাসী গ্যাং পরিচালনা করছেন।
তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজি, হত্যা, ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের নেতৃত্বের অভিযোগ।


কানাডায় সন্ত্রাসী ঘোষণা

সম্প্রতি কানাডা সরকার লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে।
কানাডার জননিরাপত্তামন্ত্রী গ্যারি আনান্দাসাঙ্গারী বলেন,

“বিষ্ণোই গ্যাং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও ভয় দেখানোর লক্ষ্য করেছে। এদের তালিকাভুক্ত করা আমাদের অপরাধ দমনকে আরও শক্তিশালী করবে।”

কানাডার অভিযোগ, ভারত বিষ্ণোই গ্যাংকে ব্যবহার করে শিখ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
এই ঘোষণার ফলে কানাডা সরকার এখন গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পদ জব্দতহবিল বন্ধ করার ক্ষমতা পেয়েছে।


গ্রামের ছেলে থেকে গ্যাং লিডার

লরেন্স বিষ্ণোইর (আসল নাম বালকরন ব্রার) জন্ম পাঞ্জাবের ছোট গ্রাম দুতারাওয়ালিতে।
বাবা ছিলেন হরিয়ানা পুলিশের কনস্টেবল, মা চেয়েছিলেন ছেলে পড়ালেখা করে মানুষ হোক।
ছোটবেলা থেকে শান্ত, বিনয়ী ও ধর্মপ্রাণ এই তরুণের জীবন হঠাৎ বদলে যায় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর।
সেখানকার ছাত্ররাজনীতির সহিংসতা ও প্রভাবের খেলাই তাঁকে টেনে নেয় অপরাধের জগতে।


সালমান খান ও মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ড

২০১৮ সালে সালমান খানকে হত্যার হুমকি দিয়ে খবরের শিরোনামে আসেন বিষ্ণোই।
কারণ—সালমান ১৯৯৮ সালে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করেছিলেন, যেগুলো বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র।
এই হরিণ হত্যা তাঁকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

সাংবাদিক জুপিন্দারজিৎ সিং বলেন, “বিষ্ণোইয়ের উদ্দেশ্য ছিল সালমান খানকে ভয় দেখানো ও কৃষ্ণসার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া।”

২০২২ সালে পাঞ্জাবি র‌্যাপার সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডে তাঁর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।
যদিও বিষ্ণোই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবে জেল থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন,

“ওকে (সালমান খান) শাস্তি দেওয়াই আমার জীবনের লক্ষ্য।”


আন্তর্জাতিক ছায়া ও রাজনৈতিক উত্তাপ

ভারত, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডা পর্যন্ত তাঁর গ্যাংয়ের প্রভাব বিস্তৃত।
কানাডার শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যার পেছনেও তাঁর নাম উঠে এসেছে।
কানাডা-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির পেছনেও এই গ্যাংয়ের ভূমিকা আলোচিত।


ধর্মভক্ত না গ্যাংস্টার?

বিষ্ণোই নিজেকে ঈশ্বরভক্ত, নেশামুক্ত ও দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন।
২০২৩ সালে কারাগার থেকে এবিপি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন—

“আমাকে গ্যাংস্টার বলা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। এটা সেই পরিচয়, যা ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন।”
“৯ বছর জেলে কাটিয়ে আমি এখন ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি না। আমি যেমন আছি, তাতেই ভালো আছি।”


গ্রামের এক শান্ত স্বভাবের ছেলে থেকে আন্তর্জাতিক গ্যাং লিডারে পরিণত হওয়া লরেন্স বিষ্ণোই এখন ভারতের অপরাধজগতের এক কিংবদন্তি নাম।
কারাগারে বসেও তাঁর প্রভাব ছড়িয়ে আছে সীমান্তের বাইরে, আর বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাঁর নাম ঘিরে আতঙ্ক ও কৌতূহল।

Share with others

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *