পৌত্তলিকতা থেকে খ্রিস্টানত্ব: রোমানদের বিস্ময়কর রূপান্তর

প্রায় দুই হাজার বছর ধরে টিকে থাকা ইতিহাসের এক পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য হলো রোম। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে শুরু হয়ে জুলিয়াস সিজারের মতো ক্ষমতাধর সম্রাটদের হাতে এটি পরাক্রমের শীর্ষে পৌঁছায়। কিন্তু কালের প্রবাহে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত পঞ্চদশ শতকে বিলীন হয়ে যায় এই সাম্রাজ্য। আশ্চর্যের বিষয় হলো, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পরও এটি টিকে ছিল প্রায় আটশো বছর। সেই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রোমে ঘটেছিল অসংখ্য পরিবর্তন, জন্ম নিয়েছিল নতুন অধ্যায়।


রোমান কারা?

রোমানদের সূচনা ইতালিতে, রাজধানী রোম শহরকেন্দ্রিক হয়ে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে টাইবার নদীর তীরে সাত পাহাড়ঘেরা রোম নগরীর বিকাশ ঘটে। শুরুতে তারা শুধুমাত্র ইতালির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ক্রমে সীমানা ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

প্রথমে রোম ছিল নগর-রাষ্ট্রগুলোর একটি জোট, যাকে বলা হতো রোমান রিপাবলিক। প্রায় পাঁচশো বছর টিকে থাকা এই প্রজাতন্ত্র পরে রূপ নেয় রাজতন্ত্রে, যা স্থায়ী হয়েছিল আরও পনেরশো বছর। সব মিলিয়ে এই দুই হাজার বছর মানবসভ্যতায় রোমানদের ছাপ অমোচনীয় হয়ে আছে।


সাম্রাজ্যের উত্থান ও বিস্তার

শত শত যুদ্ধ ও অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়েই রোম শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জুলিয়াস সিজারের সময়ে তারা ভূমধ্যসাগরের একচ্ছত্র অধিপতি হয়। তাঁর মিশর জয় এবং রানি ক্লিওপেট্রার সঙ্গে সম্পর্ক ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে।

সিজারের মৃত্যুর পর তাঁর পালকপুত্র অগাস্টাস সিজার প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন রোমান সাম্রাজ্য। অগাস্টাসই প্রথম সম্রাট ছিলেন। মজার বিষয় হলো, অগাস্টাস ও তাঁর পালকপিতা জুলিয়াস সিজার—দুজনের নামেই আজকের ক্যালেন্ডারে মাসের নামকরণ হয়েছে (জুলাই ও আগস্ট)। এমনকি অগাস্টাসের সম্মানে আগস্ট মাসকে ৩১ দিনের করে রাখা হয়, আর সেই বলি আজও ফেব্রুয়ারি মাস, যার দিন সংখ্যা ২৮!


রোমানদের ধর্ম: পৌত্তলিকতা থেকে খ্রিস্টানত্ব

রোমানরা প্রথম আটশো বছর ধরে ছিল পৌত্তলিক, তাদের প্রধান দেবতা ছিলেন জুপিটার। যীশু খ্রিস্টের জন্মের সময়ও রোমান সম্রাট ছিলেন অগাস্টাস।

শুরুর দিকে খ্রিস্টধর্মকে সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করত রোমানরা। যীশুর একত্ববাদের শিক্ষা তাদের বহু-ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসের বিপরীতে দাঁড়ায়, তাই খ্রিস্টানদের উপর চালানো হয়েছিল নির্মম নির্যাতন।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সাধারণ মানুষের মধ্যে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটে। চতুর্থ শতকে সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলে বড় পরিবর্তন আসে। পরে সম্রাট থিওডোসিয়াস একে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই থেকে রোমানরাই হয়ে ওঠে খ্রিস্টান বিশ্বের রক্ষক।


পূর্ব ও পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য

সাম্রাজ্য ক্রমে এতটাই বিশাল হয়ে ওঠে যে, খ্রিস্টীয় ২৮৫ সালে সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ান একে ভাগ করেন—পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য (রাজধানী রোম) ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য (রাজধানী বাইজান্টিয়াম/পরবর্তীতে কনস্টানটিনোপল)। পূর্বাংশটি ইতিহাসে পরিচিত হয় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য নামে।

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ‘বার্বারিয়ান’দের হাতে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এরপর থেকে রোমান বলতে কেবল বাইজান্টাইনকেই বোঝানো হতো। ইসলামী পরিভাষায় যাদেরকে ‘রুম’ বলা হয়েছে, তারাও ছিল এই বাইজান্টাইনরা।


ইসলাম ও রোমানদের সংঘর্ষ

ইসলামের উত্থানের সময়ে পারস্য ও বাইজান্টাইনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে ছিল। প্রথম বড় সংঘর্ষ হয় মুতার যুদ্ধে (৬২৮ খ্রিস্টাব্দে)। এরপর খলিফা উমর (রা.)-এর সময়ে একের পর এক যুদ্ধে রোমানরা পরাজিত হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে), যেখানে মুসলিমরা বিজয়ী হয়ে সিরিয়া চিরতরে নিজেদের দখলে নেয়।


চূড়ান্ত পতন: কনস্টানটিনোপলের অবসান

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। অবশেষে ১৪৫৩ সালে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মেহমেদ ফাতিহ) কনস্টানটিনোপল জয় করেন। প্রায় এক হাজার বছরের বেশি সময় টিকে থাকা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। শহরের নতুন নাম রাখা হয় ইসলামবুল (অর্থ: ইসলামের আধিপত্য), যা পরে পরিবর্তিত হয়ে আজকের ইস্তানবুল নামেই পরিচিত।


উত্তরাধিকার

আজ রোমানরা আর নেই, কিন্তু তাদের উত্তরাধিকার অম্লান। স্থাপত্য, আইন, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির মাধ্যমে তারা এখনও জীবন্ত। রোমান সভ্যতার প্রভাব এতটাই গভীর যে, এর উপর লাখো বই লেখা হলেও গবেষণা শেষ হয়নি। ইতিহাসবিদদের কাছে এটি চিরকালই আকর্ষণীয় এক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Share with others

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *