
করতোয়ার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মহাস্থানগড় শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়, বরং বাংলার সভ্যতা, ইতিহাস আর কিংবদন্তির জীবন্ত দলিল
পুণ্ড্রবর্ধন ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ জনপদ। এই পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর, যা পরবর্তী সময়ে মহাস্থানগড় হিসেবে পরিচিত হয়। এটি মৌর্য সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল।
বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় করতোয়া নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে মহাস্থানগড়—বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যপূর্ণ প্রত্নস্থল। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই প্রাচীন দুর্গনগর আজও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
ইতিহাস ও ঐতিহ্য
‘মহাস্থান’ মানে পবিত্র স্থান, আর ‘গড়’ মানে দুর্গ। প্রায় ২,৫০০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই নগরী ছিল বৌদ্ধ শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। চীন ও তিব্বত থেকে বহু সন্ন্যাসী এখানে এসে শিক্ষা নিতেন এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে দিতেন সেই জ্ঞান। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙও তার ভ্রমণকাহিনীতে মহাস্থানগড়ের উল্লেখ করেছেন।
মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন রাজাদের আমলে মহাস্থানগড় ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী। মুসলিম শাসনামলেও এর গুরুত্ব কমেনি। তবে সময়ের প্রবাহে দুর্গ নগর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণে রয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থান। ২০১৬ সালে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবেও স্বীকৃতি পায় এটি।
জনপ্রিয় কাহিনি ও কিংবদন্তি

লোককাহিনি বলে, সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেনের আমলে মহাস্থানে শাসন করতেন রাজা নল। কিন্তু পরবর্তীতে অভিশপ্ত ব্রাহ্মণ পরশুরাম রাজা হয়ে ওঠেন এবং হয়ে ওঠেন অত্যাচারী শাসক। তখনই আফগানিস্তানের বলখ থেকে আগমন ঘটে হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র.)-এর, যিনি মাছের পিঠে চড়ে করতোয়া নদী পাড়ি দিয়েছিলেন বলে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এজন্যই তার নাম হয় “মাহিসাওয়ার”।
অবশেষে শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র.)-এর সঙ্গে পরশুরামের যুদ্ধ হয়, যেখানে পরশুরাম নিহত হন। বর্তমানে মহাস্থানগড়েই রয়েছে তার মাজার শরীফ।
প্রত্ননিদর্শন ও দর্শনীয় স্থান
আজও মহাস্থানগড়ে টিকে আছে বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন—
- গোকুল মেধ বা বেহুলা-লখিন্দরের বাসরঘর: সম্রাট অশোকের তৈরি বৌদ্ধ মঠ বলে ধারণা করা হয়।
- খোদার পাথর ভিটা: পরশুরামের বলিদানস্থল হিসেবে পরিচিত।
- শীলাদেবীর ঘাট: যেখানে রাজা পরশুরামের বোন আত্মাহুতি দেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
- ভাসু বিহার: বৌদ্ধ সংঘারামের ধ্বংসাবশেষ।
- ভীমের জাঙ্গাল: প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ।
- পরশুরামের প্রাসাদ, গোবিন্দ ভিটা, কালিদহ সাগরসহ অসংখ্য নিদর্শন।
এছাড়া আশেপাশে মানকালীর ঢিবি, বৈরাগীর ভিটা, তোতারাম পণ্ডিতের ধাপসহ আরো অনেক স্থান ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
ধ্বংস ও পুনরুদ্ধার

১৪শ শতকে ইলিয়াস শাহ বাংলা নামে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলে মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। পরবর্তীতে এটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ১৮০৮ সালে ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন প্রথম এ ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করেন। পরে আলেকজান্ডার কানিংহাম এটিকে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর হিসেবে নিশ্চিত করেন।
১৯২৮ সালে প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ শুরু হয় কাশীনাথ নারায়ণ দীক্ষিতের নেতৃত্বে। ১৯৩১ সালে পাওয়া ব্রাহ্মী লিপিতে উল্লেখ পাওয়া যায় সম্রাট অশোক দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষকে সাহায্য করেছিলেন।
মহাস্থান জাদুঘর

১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে এখানকার উৎখননে পাওয়া মূর্তি, মুদ্রা, শিলালিপি, পোড়ামাটির ফলক, অস্ত্র, অলঙ্কার, সোনা-রূপা-তামার সামগ্রীসহ অসংখ্য নিদর্শন।