
ঢাকার হৃদয়ে অবস্থিত লালবাগ কেল্লা শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা নয়, বরং এটি বাংলার ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত বিভিন্ন শাসনামলের গল্প ধারণ করে আছে এই ঐতিহাসিক কেল্লা।
মুঘল আমলে নির্মাণ শুরু
লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৭৮ সালে। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র মোহাম্মদ আজম শাহ ঢাকার সুবাদার থাকাকালীন এই কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু করেন। প্রথমদিকে এর নাম ছিল “আওরঙ্গাবাদ কেল্লা”। পরে সম্রাট আওরঙ্গজেব তার মামা শায়েস্তা খানকে সুবাদার নিযুক্ত করলে, তিনি এর নির্মাণকাজ এগিয়ে নিয়ে যান।
নির্মাণ বন্ধের করুণ ইতিহাস
১৬৮৪ সালে শায়েস্তা খানের কন্যা পরীবিবি রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করলে, তিনি এই কেল্লাকে “অশুভ” মনে করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। ফলে কেল্লাটি চিরকাল অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্তমানে পরীবিবির সমাধি কেল্লার ভেতরেই অবস্থিত, যা দর্শনার্থীদের কাছে নানা কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে কেল্লা
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা কেল্লাটিকে প্রশাসনিক শিবির, সৈন্যদের ব্যারাক এবং অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের অবহেলা ও পরিবর্তনের কারণে কেল্লার অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাকিস্তান আমলে দীর্ঘ সময় এটি অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকে। পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে এটি পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আসে।
স্বাধীনতার পর বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার লালবাগ কেল্লাকে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ঘোষণা করে। বর্তমানে এটি ঢাকার অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক ভিড় জমায়।
কেল্লার প্রধান স্থাপনা
১. পরীবিবির সমাধি – সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত।
২. শাহী মসজিদ – মুঘল স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
৩. দিওয়ান-ই-আম – প্রশাসনিক বৈঠকের স্থান।
৪. দিওয়ান-ই-খাস – বিশেষ অতিথিদের জন্য সভাকক্ষ।
৫. বাগান ও জলের ট্যাংক – মুঘল উদ্যান স্থাপত্যের দৃষ্টান্ত।
নামকরণের ইতিহাস
প্রথমে কেল্লার নাম ছিল “আওরঙ্গাবাদ কেল্লা”। শায়েস্তা খানের সময় থেকেই এটি “লালবাগ কেল্লা” নামে পরিচিত হয়। ধারণা করা হয়, লাল রঙের ইট এবং আশেপাশের বাগান থেকেই এ নামকরণ।
বিশেষ তথ্য
- ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার লালবাগ কেল্লাকে “জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা” ঘোষণা করে।
- বর্তমানে কেল্লার ভেতরে একটি জাদুঘর রয়েছে, যেখানে মুঘল আমলের নানা প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত।
- প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী কেল্লাটি পরিদর্শন করে।
উপসংহার
লালবাগ কেল্লা শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষ্য। এই কেল্লা আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা আজও স্মরণ করিয়ে দেয়।