
বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও রহস্যময় স্থানগুলোর মধ্যে একটি হলো কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। এই এলাকার মাঝেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাসের নির্বাক সাক্ষী শালবন বৌদ্ধ বিহার। এটি শুধু একটি ইটের স্তূপ নয়; বরং একসময়ের জ্ঞানচর্চা, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং অনন্য স্থাপত্যশিল্পের উজ্জ্বল নিদর্শন।
রাজা ভবদেবের মহান স্থাপনা
প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এই বিহার নির্মাণ করেছিলেন। এর ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া নিদর্শনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে দীর্ঘ প্রায় ছয় শতাব্দী (৭ম থেকে ১২শ শতক) ধরে এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বসবাস, বিদ্যাচর্চা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে গিয়েছিলেন। সময়ের প্রবাহে অন্তত ছয়বার এই বিহার নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের প্রমাণও মিলেছে।
স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন
বিহারটির স্থাপত্য যে কাউকে বিস্মিত করবে। চতুর্ভুজাকার এই বিশাল বিহারের প্রতিটি বাহু প্রায় ১৬৮ মিটার দীর্ঘ এবং চারপাশের দেয়াল প্রায় ৫ মিটার পুরু, যা সে সময়ে এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করত। ভেতরে রয়েছে মোট ১৫৫টি কক্ষ, যেখানে ভিক্ষুরা বসবাস করতেন। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে প্রদীপ জ্বালানো বা দেবমূর্তি রাখার জন্য তৈরি ছিল তিনটি কুলুঙ্গি।
বিহারের একেবারে মাঝখানে ছিল একটি প্রধান মন্দির, আর উত্তরের মাঝামাঝি অংশে ছিল একমাত্র প্রবেশদ্বার, যা নিরাপত্তার দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করত।
প্রাচীন ‘কমন রুম’ ও ভিক্ষুদের জীবন
বিহারের বাইরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে প্রত্নতাত্ত্বিকরা আবিষ্কার করেছেন একটি বড় হলঘর। ধারণা করা হয়, এটি ছিল ভিক্ষুদের খাবার ঘর বা কমন রুম, যেখানে তারা একত্রে আহার করতেন। প্রায় ১০ মিটার বাই ২০ মিটার আয়তনের এই ঘরটি চারটি বিশাল গোলাকার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল।
খননে রোমাঞ্চকর আবিষ্কার
খননকাজে এখান থেকে উদ্ধার হয়েছে অসংখ্য মূল্যবান প্রত্নবস্তু, যেমন—
আটটি প্রাচীন তাম্রলিপি
প্রায় ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা
নান্দনিক পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা)
ব্রোঞ্জ ও মাটির তৈরি সূক্ষ্ম মূর্তি
সিলমোহর
এসব নিদর্শন শালবন বিহারকে শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসস্তূপ নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাচীন সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্যে পরিণত করেছে।