
কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে বহু সভ্যতা, তবে তাদের অস্তিত্ব আজও টিকে আছে ইতিহাসের পাতায়। কিছু সভ্যতার নিদর্শন আজও পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে, যেন নিঃশব্দে অতীতের কথা বলে চলে। পৃথিবীর ইতিহাসে সমৃদ্ধ ও খ্যাতিমান সভ্যতাগুলোর মধ্যে ইনকা সভ্যতা অন্যতম। আর এই ইনকাদের সবচেয়ে রহস্যময় ও আলোচিত নগরী হলো মাচু পিচু, যাকে অনেকে ‘সূর্যনগরী’ বা ‘দুর্গনগরী’ নামেও চেনে। শত গবেষণা ও অনুসন্ধানের পরও আজও এই শহরকে ঘিরে রয়েছে অনেক অমীমাংসিত রহস্য।
কোথায় অবস্থিত এই রহস্যনগরী?
মাচু পিচু অবস্থিত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার এক চূড়ায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ২,৪০০ মিটার (৭,৮৭৫ ফুট)—যা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া তাজিনডং-এর প্রায় দ্বিগুণ! শহরটির একপাশ প্রায় ৬০০ মিটার খাড়া ঢালু হয়ে নিচের উরুবাম্বা নদীতে নেমে গেছে। অপরদিকে, সুউচ্চ হুয়ায়না পিচু পর্বত প্রাকৃতিক প্রাচীরের মতো একে রক্ষা করেছে। এর দুর্গম ও সুরক্ষিত অবস্থানই একে ‘দুর্গনগরী’ নাম এনে দিয়েছে।
কেন তৈরি হয়েছিল মাচু পিচু?
ইতিহাসবিদদের ধারণা অনুযায়ী, শহরটি নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে। তবে মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যেই স্প্যানিশ বিজেতারা ইনকা সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালায় এবং প্রায় সব প্রধান শহর ধ্বংস করে ফেলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা কখনোই মাচু পিচুর অবস্থান খুঁজে পায়নি। ফলে এটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়, কিন্তু ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে জঙ্গলে ঢেকে যায়।
শহরটি কেন নির্মিত হয়েছিল তা নিয়ে কয়েকটি প্রচলিত মত রয়েছে—
- কেউ মনে করেন, এটি ছিল সম্রাট পাচাকুতির রাজকীয় অবকাশযাপন কেন্দ্র।
- অন্যদের মতে, এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণার কেন্দ্র। এর প্রমাণ মেলে Intihuatana (সূর্যের বাঁধন স্তম্ভ), সূর্যদেবতার মন্দির ও মহাজাগতিক ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণের জন্য নির্মিত স্থাপনা থেকে।
- আরেকটি মত হলো, এটি ছিল এক অনন্য কৃষি কেন্দ্র, যেখানে পাহাড়ি ঢালে সোপান চাষ (Terrace Farming) পদ্ধতিতে ভুট্টা, আলু ও কোকা চাষ হতো।
মাচু পিচুতে কী কী দেখার আছে?
আজও মাচু পিচুতে গিয়ে দেখা যায় অসংখ্য নিদর্শন—
- কৃষি সোপান (Terraces): পাহাড়ি ঢালে ধাপে ধাপে তৈরি চমৎকার কৃষিজমি, যা মাটি ক্ষয় রোধ ও সেচের জন্য ব্যবহার হতো।
- নগর এলাকা: প্রায় ২০০টি পাথরের ঘর, যেখানে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে পুরোহিত ও অভিজাতরা বাস করত। ধারণা করা হয়, এখানে সর্বোচ্চ ৭৫০ থেকে ১,০০০ মানুষ বসবাস করত।
- Intihuatana পাথর: নিখুঁতভাবে খোদাই করা একটি পাথর, যা সূর্যের ঘড়ি বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ক্যালেন্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে বিশ্বাস করা হয়।
- কন্ডরের মন্দির: পাথরে খোদাই করা এক বিশাল কন্ডর পাখির প্রতিচ্ছবি, যার প্রকৃত ধর্মীয় অর্থ আজও রহস্য।
- সূর্যদেবতার মন্দির: অর্ধবৃত্তাকার এই মন্দিরটি নিখুঁত পাথরকর্মের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত।
কীভাবে আবিষ্কৃত হলো?
স্থানীয় কিছু মানুষ বহু বছর ধরে শহরটির অস্তিত্ব জানলেও বাইরের পৃথিবীর কাছে এটি ছিল অজানা। অবশেষে ১৯১১ সালে মার্কিন ইতিহাসবিদ ও অভিযাত্রী হাইরাম বিংহাম, স্থানীয় এক বালকের সাহায্যে দুর্গম জঙ্গল আর পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে এই ‘হারানো শহর’কে বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেন। সেই থেকেই মাচু পিচু পরিণত হয় প্রত্নতাত্ত্বিক, গবেষক এবং পর্যটকদের এক স্বপ্নের গন্তব্যে।
অমীমাংসিত রহস্য
মাচু পিচুকে ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত—
- কীভাবে এত ভারি পাথর উঁচু পাহাড়ে তুলে আনা হয়েছিল?
- কীভাবে তারা নিখুঁতভাবে পাথর কেটে এমন অনবদ্য স্থাপত্যশৈলী তৈরি করেছিল?
- শহরটি কি সত্যিই কেবল ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল?
- হঠাৎ করেই বা কেন ইনকারা এই শহর ত্যাগ করল?
আজকের মাচু পিচু
মাচু পিচু কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং মানবসভ্যতার বুদ্ধিমত্তা, প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম এবং ইনকা সাম্রাজ্যের মহিমার এক নিঃশব্দ সাক্ষী। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। আজও এটি দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়চূড়ায়, সব রহস্য আর গৌরব নিয়ে—যেন ইতিহাস নিজেই সেখানে জীবন্ত হয়ে আছে।