বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা কি ‘আদিবাসী’?

বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ। এখানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বসবাস করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি বিতর্ক চলে আসছে—এরা কি বাংলাদেশের আদিবাসী, নাকি কেবলমাত্র অভিবাসী জাতিগোষ্ঠী? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল আদিবাসী পরিচয়কে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করছে, যা দেশের ইতিহাস এবং সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করছে। তাই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং নৃতত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে।
‘আদিবাসী’ শব্দের প্রকৃত অর্থ
‘আদিবাসী’ মানে হলো আদিমতম অধিবাসী বা ভূমিপুত্র। ইংরেজিতে এর প্রতিশব্দ Indigenous people। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গান তাঁর বই An Introduction to Anthropology (1972)-এ বলেছেন:
“The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the true sons of the soil.”
অর্থাৎ যারা স্মরণাতীতকাল থেকে কোনো স্থানে বসবাস করছে এবং যাদের উৎপত্তি বা স্থানান্তর ইতিহাস অজানা, তারাই প্রকৃত আদিবাসী। যদি কোনো জনগোষ্ঠীর আগমনকাল জানা যায় এবং তারা অন্য স্থান থেকে স্থানান্তরিত হয়, তবে তাদের আদিবাসী বলা যায় না।
১. প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ
বাংলাদেশের ইতিহাসের শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত। প্রত্নতত্ত্ববিদরা রাঙামাটি থেকে Stone Element (পাথরের অস্ত্র) এবং ফেনী থেকে Hand Axe (কুঠার) আবিষ্কার করেছেন, যেগুলোর বয়স প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ বছর।
এটি প্রমাণ করে যে এ ভূখণ্ডে প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের বসতি ছিল—এবং তারা ছিল বাঙালি জনগোষ্ঠীর পূর্বসূরি।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস মাত্র কয়েক শতাব্দী পুরোনো। অর্থাৎ বাঙালিরা এখানে বসবাস করছিল বহু আগে থেকেই, আর পাহাড়িরা পরে এখানে এসেছে।
২. পাহাড়িদের আগমন ইতিহাস
বিভিন্ন গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী মিয়ানমার ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিবাসন করে এসেছে।
চাকমা জনগোষ্ঠী:
চাকমা গবেষক অমেরেন্দ্র লাল খিসা তাঁর বই Origins of Chakma Peoples of Hill Tract Chittagong-এ উল্লেখ করেন যে চাকমারা প্রথমে মংখেমার অঞ্চল থেকে আরাকানে গিয়েছিল এবং পরে মগদের আক্রমণে তাড়িত হয়ে প্রায় ২৫০-৩০০ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে।
ব্রিটিশ কর্মকর্তা টি. এইচ. লেউইন (1869) লিখেছেন:
“A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly came about two generations ago from Arakan.”
অর্থাৎ চাকমারা মূলত আরাকান থেকে শরণার্থী হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
মারমা জনগোষ্ঠী:
মারমারা ১৭৮৪ সালে বার্মা থেকে দলে দলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি গড়ে তোলে।
এমনকি বান্দরবনের সাবেক মং রাজা অংশে প্রু চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমরা এই অঞ্চলে আদিবাসী নই।”
ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী:
পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে পালিয়ে একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
গারো জনগোষ্ঠী:
গারোদের আদি নিবাস ভারতের মেঘালয় ও গারোল্যান্ড। ব্রিটিশ শাসনামলে অনেকে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়।
৩. সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
সিলেটের খাসিয়া, মণিপুরী, পাত্র জনগোষ্ঠী ভারতের আসাম, মণিপুর ও মেঘালয় অঞ্চল থেকে যুদ্ধ ও মহামারী এড়িয়ে বাংলাদেশে আসে।
ব্রিটিশরা চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে ভারতের ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁরাও, কোল প্রভৃতি গোষ্ঠীকে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারে নিয়ে আসে।
রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে সাঁওতালরা এসেছে ভারতের রাজমহল এলাকা থেকে।
এগুলো সবই প্রমাণ করে যে তারা বহিরাগত অভিবাসী, স্থানীয় আদিবাসী নয়।
৪. সরকারি ও ঐতিহাসিক দলিল
১৯৭৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় নেতারা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যে স্মারকলিপি দেন, সেখানে নিজেরাই নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
১৯৯৩ সালের জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমার বইয়েও পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালের বিরাজ মোহন দেওয়ানের চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত বইতেও একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
এটি প্রমাণ করে যে, অতীতে তারাও নিজেদের উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করতেন।
৫. বাঙালির প্রাচীন অস্তিত্ব
বাংলাদেশের প্রাচীন জনগোষ্ঠী ছিল অনার্য, যারা পরে আর্যদের প্রভাবে সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে।
চর্যাপদ, বৌদ্ধ রাজাদের ইতিহাস এবং বাংলা ভাষার প্রাচীন সাহিত্য প্রমাণ করে যে এ ভূখণ্ডে বাঙালি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব হাজার বছরের পুরোনো।
অন্যদিকে চাকমা, মারমা, গারো বা সাঁওতালদের ইতিহাস সর্বোচ্চ কয়েক শতাব্দীর।
অর্থাৎ স্মরণাতীতকাল থেকে এ ভূখণ্ডে বসবাসকারী একমাত্র মূল জনগোষ্ঠী হলো বাঙালিরাই, তাই প্রকৃত আদিবাসীও তারাই।
৬. যুক্তি বিশ্লেষণ
যদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়, তবে অনেক জটিল প্রশ্নের উদ্ভব হবে। যেমন—
সরকার যদি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পুনর্বাসিত করে, ভবিষ্যতে কি তাদেরও বাংলাদেশের আদিবাসী ধরা হবে?
ঢাকার আদি বাসিন্দারা কি আদিবাসী, নাকি কেবল রাজধানীর পুরনো অধিবাসী?
তাহলে স্পষ্ট হয়, অভিবাসী জনগোষ্ঠী কখনো নতুন স্থানে আদিবাসী হতে পারে না।
উপসংহার
ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং নৃতত্ত্বের সমস্ত প্রমাণই স্পষ্টভাবে দেখায় যে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি বাংলাদেশের বাইরে—বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে। তারা কয়েকশ বছর আগে অভিবাসন করে এসেছে।
সুতরাং, স্মরণাতীতকাল থেকে এখানে বসবাসকারী একমাত্র জনগোষ্ঠী বাঙালিরাই এবং প্রকৃত আদিবাসীও তারাই।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ‘উপজাতি’ বা ‘সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী’ বলা যেতে পারে, কিন্তু ‘আদিবাসী’ বলা ইতিহাস বিকৃতি এবং জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী।



