মহাস্থানগড়ের ‘বেহুলার বাসরঘর’
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু স্থান আছে, যেখানে লোককথা আর বাস্তব ইতিহাস পাশাপাশি হেঁটে চলে। বগুড়ার মহাস্থানগড় তেমনই একটি জায়গা। এখানে “বেহুলার বাসরঘর” নামে পরিচিত একটি স্থাপনা রয়েছে, যা নিয়ে বহু মানুষের মনে কৌতূহল। এটি কি সত্যিই মনসামঙ্গলের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনির অংশ, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা? এই লেখায় আমরা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব।
বাংলা লোকসাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় ধারা মনসামঙ্গল কাব্য। এখানে বেহুলা ও লখিন্দরের গল্প বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে। কাহিনিতে দেখা যায়, মনসা দেবীর অভিশাপে লখিন্দরের মৃত্যু হয় এবং বেহুলা তাকে নিয়ে দীর্ঘ যাত্রায় বের হয় স্বামীর প্রাণ ফেরানোর জন্য।
এই গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত। কিন্তু এই কাহিনির সাথে মহাস্থানগড়ের কী সম্পর্ক?
মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন নগরীর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি প্রাচীন পুণ্ড্রনগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে ধারণা করা হয়, যার ইতিহাস খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত।
এখানে পাওয়া গেছে:
- প্রাচীন নগর প্রাচীর
- মুদ্রা ও শিলালিপি
- মন্দির ও স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ
এই সব প্রমাণ করে যে মহাস্থানগড় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল।
বেহুলার বাসরঘর’ আসলে কী?
মহাস্থানগড়ের কাছাকাছি একটি স্থাপনাকে স্থানীয়ভাবে “বেহুলার বাসরঘর” বলা হয়। এটি একটি প্রাচীন ইটের কাঠামো, যা দেখতে অনেকটা মঞ্চ বা ঘরের মতো।
কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে:
- এটি সম্ভবত একটি বৌদ্ধ বা হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনা
- কোনো কোনো গবেষকের মতে এটি মন্দির বা পূজার মঞ্চ
- আবার কেউ কেউ এটিকে স্মৃতিস্তম্ভ বা আচারস্থল বলে মনে করেন
অর্থাৎ, এটি বেহুলার বাস্তব বাসরঘর হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
মানুষের মনে গল্পের প্রভাব খুবই শক্তিশালী। মহাস্থানগড়ের এই রহস্যময় স্থাপনাকে মানুষ সহজে বোঝার জন্য পরিচিত কোনো গল্পের সাথে যুক্ত করেছে। সেই গল্পই হলো বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি।
এই প্রক্রিয়াটি নতুন নয়। ইতিহাসের অনেক স্থানেই দেখা যায়:
- লোককাহিনি বাস্তব স্থানের সাথে যুক্ত হয়ে যায়
- মানুষের বিশ্বাস সেই স্থানকে নতুন অর্থ দেয়
- সময়ের সাথে সাথে সেই বিশ্বাসই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—লোককাহিনি মানেই মিথ্যা নয়, আবার সব লোককাহিনি ইতিহাসও নয়। বেহুলার গল্প আমাদের সংস্কৃতির অংশ, কিন্তু মহাস্থানগড়ের স্থাপনাটি একটি বাস্তব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।