তিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন...
যারা কখনো রাষ্ট্রপতি হননি।
কখনো প্রধানমন্ত্রী হননি।
কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না।
তবুও ইতিহাস তাদের ভুলতে পারেনি।
কারণ...
কখনো কখনো একজন সাধারণ মানুষও ইতিহাসের সবচেয়ে অসাধারণ চরিত্র হয়ে ওঠেন।
আজকের গল্প এমনই একজন মানুষকে নিয়ে।
যিনি কোনো বক্তৃতা দেননি।
কোনো মিছিলে নেতৃত্ব দেননি।
কিন্তু যার ছোট্ট একটি ক্যান্টিন থেকে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য আন্দোলনের পরিকল্পনা।
যার নাম আজও উচ্চারিত হয় হাজারো শিক্ষার্থীর মুখে।
তিনি...
মধুসূদন দে।
সবার প্রিয়—
মধুদা।
মধুসূদন দে ১৯১৯ সালের এপ্রিলে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বিক্রমপুরের বাবু দিঘীর পাড় গ্রামে। তাঁর পিতামহ নকরীচন্দ্র দে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সপরিবারে ঢাকায় স্থানান্তরিত হন
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তাঁর পিতা আদিত্যচন্দ্র দে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন।
মধুসূদনের শৈশব কোনো রাজকীয় পরিবেশে কাটেনি।
খুব অল্প বয়স থেকেই বাবার পাশে কাজ শিখতে শুরু করেন।
মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি দোকানের কাজে নিয়মিত সাহায্য করতে থাকেন।
তখন হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না—
এই ছোট্ট দোকানই একদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।
সেই সময় আজকের ঢাকা মেডিকেল কলেজ ভবনই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন।
ক্যাম্পাসের পাশেই ছিল আদিত্যচন্দ্রের সেই ছোট্ট খাবারের দোকান।
বুদ্ধদেব বসু তাঁর স্মৃতিচারণায় আদিত্যচন্দ্রের টিনের চালওয়ালা দর্মার ঘর এবং ন্যাড়া টুলের অত্যন্ত প্রাণবন্ত বিবরণ দিয়েছেন।
১৯৩৯ সালে মধুসূদনের বাবা পক্ষাঘাতে মারা যান।
হঠাৎ করেই পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ মধুসূদনের কাঁধে।
তিনি বাবার ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
কয়েক বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বর্তমান ভবনটি ক্যান্টিন হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
এই ভবনটিরও নিজস্ব ইতিহাস ছিল।
একসময় এটি নবাবদের নাচঘর ছিল।
পরে দরবার হল।
১৯০৬ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ।
আর এরপর...
এটি হয়ে ওঠে মধুর ক্যান্টিন।
মধুদা শুধু চা বিক্রি করতেন না।
তিনি ছাত্রদের আপন মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।
অনেক ছাত্রের কাছে টাকা থাকত না।
তারা বাকিতে চা খেত।
মধুদা কখনো তাদের ফিরিয়ে দিতেন না।
তিনি একটি খাতায় লিখে রাখতেন—
"আজ মোয়াজ্জেম সাহেব... ১০ কাপ"
"আজ জাফর সাহেব... ১৫ কাপ
কিন্তু পরে অনেকেই লিখেছেন—
তিনি নিজেও জানতেন না কে কত কাপ চা খেয়েছে।
আহমদ ছফা এই স্মৃতি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘টাকাটা আদায় হতো কি না, আমার সন্দেহ।
ধীরে ধীরে মধুর ক্যান্টিন বদলে যেতে থাকে।
এটি আর শুধু খাবারের দোকান থাকল না।
এটি হয়ে উঠল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র।
ভাষা আন্দোলন।
শিক্ষা আন্দোলন।
স্বায়ত্তশাসনের দাবি।
ছয় দফা।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান।
বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আর পরিকল্পনার নীরব সাক্ষী ছিল এই ক্যান্টিন।
মধুদা কখনো রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়াননি।
কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস তাঁর ক্যান্টিনে বসেই লেখা হয়েছে।
অনেকেই তাঁকে শুধুই একজন ক্যান্টিন মালিক ভাবতেন।
কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখেছিল।
তাদের চোখে মধুর ক্যান্টিন ছিল ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্র।
আর মধুদা—
ছিলেন সন্দেহভাজন একজন মানুষ।
তারপর এলো...
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ।
অপারেশন সার্চলাইট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রক্তে ভেসে গেল।
পাকিস্তানি সেনারা ২৬শে মার্চ সকালে শিববাড়ি কোয়ার্টারে তাঁর বাসায় হামলা চালিয়ে তাঁর স্ত্রী, জ্যেষ্ঠ পুত্র ও পুত্রবধূকে ঘরের ভেতর হত্যা করে। মধুদাকে গুরুতর আহত অবস্থায় জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়ে গিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা ও মাটিচাপা দেওয়া হয়।
একটি পরিবারের প্রায় সব আলো নিভে যায় এক সকালে।
স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেয়।
কিন্তু মধুদা আর ফিরে আসেননি।
ফিরে এসেছে শুধু তাঁর স্মৃতি
আজ মধুর ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর ভাস্কর্য।
তার নিচে লেখা— ,
"আমাদের প্রিয় মধুদা।"
একটি জাতি খুব কম মানুষকেই "আমাদের" বলে ডাকে।
মধুদা সেই সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
কারণ ইতিহাসে বড় হওয়ার জন্য সবসময় বড় পদ লাগে না।
কখনো কখনো...
এক কাপ চা,
একটি খাতা,
আর মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসাই যথেষ্ট।