
চৌদ্দ শতকের বাংলার ইতিহাসে একটি নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে – শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। দিল্লি সালতানাতের কর্তৃত্ব মানতে অস্বীকার করে যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বাধীন বাংলা সালতানাত। তাঁর জীবনকাহিনী বিশ্বাসঘাতকতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও চূড়ান্ত সাফল্যের এক মহাকাব্যের মতো।
এক নওজোয়ান থেকে সুলতান
ইলিয়াসের গল্প শুরু হয় দিল্লি সালতানাতের সময়। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনকালে আলী মুবারকের সহায়তায় তিনি ফিরোজ-বিন-রজবের অধীনে চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু ফিরোজের এক উপপত্নীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ফাঁস হলে তাঁকে প্রাণনাশের ভয় এড়াতে দিল্লি থেকে পালাতে হয়। এরপর তিনি বাংলার লখনৌতিতে আশ্রয় নেন।
বাংলায় পুনরুত্থান
লখনৌতিতে ইলিয়াস নতুন সুযোগ পান। সপ্তগ্রামের আজম-উল-মুলকের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি দ্রুত সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৪২ সালে তিনি ফখরউদ্দিন মুখলিসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বিজয়ী হন এবং বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শক্তিশালী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
স্বাধীন ‘বাঙ্গালা’ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা
১৩৪২ সালে ইলিয়াস শাহ নিজেকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গাল’ ঘোষণা করে স্বাধীন ‘বাঙ্গালা’ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অধীনে একীভূত হয় গৌড়, লখনৌতি, সপ্তগ্রাম, সুবর্ণগ্রাম, তাম্রলিপ্ত ও সমতট। এর মধ্য দিয়ে বাংলার ভাঙা অঞ্চলগুলো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়।
সামরিক ও প্রশাসনিক সংস্কার
ইলিয়াস শাহ সেনাবাহিনীতে হিন্দু সৈন্য নিয়োগ করেন, বাঙালি পদাতিক বাহিনী গঠন করেন এবং একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী নির্মাণ করেন। মুসলিম অশ্বারোহীদের একচেটিয়া প্রভাব ভেঙে তিনি সেনাবাহিনীকে বহুমুখী করে তোলেন। প্রশাসনে হিন্দু কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি ও স্থানীয় বাঙালিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। বিকেন্দ্রীকৃত শাসন ব্যবস্থা তাঁর অন্যতম সাফল্য ছিল।
বিস্তারবাদী নীতি
১৩৪৮ সালে উড়িষ্যা দখল করে তিনি কটক ও চিল্কা হ্রদ নিয়ন্ত্রণে আনেন। ১৩৫০ সালে নেপালে অভিযান চালিয়ে কাঠমান্ডু পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং পশুপতিনাথ মন্দির ধ্বংস করেন। ১৩৫১ সালে উত্তর বিহার জয় করে হাজিপুর শহর প্রতিষ্ঠা করেন। এসব সামরিক সাফল্যের ফলে বাংলার রাজনৈতিক প্রভাব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
দিল্লির সাথে সংঘর্ষ
১৩৫৩ সালে দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক বাংলা আক্রমণ করলে একডালা দুর্গে দীর্ঘ অবরোধ শুরু হয়। ইলিয়াস শাহের পদাতিক বাহিনী বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং বাংলা কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে থাকে।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক অবদান
ইলিয়াস শাহ ছিলেন ধর্মীয়ভাবে সহিষ্ণু শাসক। সুফি সাধক আখি সিরাজউদ্দীনের জন্য মসজিদ নির্মাণ করেন এবং হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান নিশ্চিত করেন। আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের বিকাশ তাঁর শাসনকালে নতুন মাত্রা পায়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বাংলার ইতিহাসে ইলিয়াস শাহের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান, যিনি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বাঙালি পরিচয়কে স্বতন্ত্র রূপ দেন এবং সামরিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে শক্তিশালী বাহিনী গঠন করেন। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের মডেল তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৩৫৮ সালে ইলিয়াস শাহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পুত্র সিকান্দর শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইলিয়াস শাহের প্রতিষ্ঠিত বাংলা সালতানাত প্রায় ২০০ বছর টিকে ছিল।
বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
একীভূত বাংলা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের যে দৃষ্টান্ত ইলিয়াস শাহ স্থাপন করেছিলেন, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর শাসন প্রমাণ করেছিল, বাংলা স্বাধীনভাবে নিজেকে শাসন করার সক্ষমতা রাখে।