অপরাধের শিকড়
অমীমাংসিত রহস্য
ইতিহাস
ইতিহাসে আজ
উদ্ভাবন ও আবিষ্কার
ঐতিহাসিক ঘটনা
ঐতিহাসিক স্থান
ঐতিহাসিক ছবি
কালের বিবর্তন
খাদ্যের ইতিহাস
খেলাধুলার ইতিহাস
ব্যক্তিত্ব
জীবনধারা
নামকরণের ইতিহাস
পৌরাণিক কাহিনি
শিল্প ও বিপ্লব
ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
মহাকাশ ইতিহাস
রাজা ও রাজ্য
শিক্ষা ও জ্ঞান
স্মরণীয় দিন
সাম্প্রতিক ইতিহাস
অমীমাংসিত রহস্য

প্রাচীন মিশরে বিড়াল মারা গেলে মানুষ কেন নিজেদের ভ্রু কামিয়ে ফেলত?

শোক প্রকাশের অদ্ভুত রীতি

By Admin · November 1, 2026 · 4 min read
প্রাচীন মিশরে বিড়াল মারা গেলে মানুষ কেন নিজেদের ভ্রু কামিয়ে ফেলত? - The Reverse Times Bangladesh History Magazine

সারসংক্ষেপ: প্রাচীন মিশরে পোষা বিড়াল মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা শোক প্রকাশের জন্য নিজেদের ভ্রু কামিয়ে ফেলতেন। এই অদ্ভুত প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের Histories গ্রন্থে। মিশরীয়দের কাছে বিড়াল ছিল বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রাণী এবং দেবী বাস্তেতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই একটি বিড়ালের মৃত্যু তাদের কাছে শুধু পোষা প্রাণী হারানোর ঘটনা ছিল না, বরং গভীর শোকের বিষয়ও ছিল।

প্রাচীন মিশরে বিড়ালের মৃত্যু মানেই ভ্রু কামিয়ে ফেলা!

আজকের দিনে পোষা বিড়াল মারা গেলে তার মালিকের মন খারাপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই শোক প্রকাশের জন্য যদি কাউকে নিজের ভ্রু কামিয়ে ফেলতে বলা হয়, তাহলে বিষয়টি নিঃসন্দেহে অদ্ভুত মনে হবে।

অবিশ্বাস্য হলেও, প্রাচীন মিশরে এমন একটি শোক পালনের রীতি প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়।

কোনো বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে একটি বিড়ালের মৃত্যু হলে সেই বাড়ির সদস্যরা নিজেদের ভ্রু কামিয়ে ফেলতেন। এটি ছিল তাদের শোক প্রকাশের একটি বিশেষ উপায়।

এই তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাসের বিখ্যাত গ্রন্থ Histories-এর দ্বিতীয় খণ্ডের ৬৬ নম্বর অধ্যায়ে।

তবে প্রশ্ন হলো, বিড়ালের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এমন অদ্ভুত প্রথা কেন গড়ে উঠেছিল?

বিড়াল কেন ছিল প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ?

প্রাচীন মিশরে বিড়াল কেবল ইঁদুর ধরার প্রাণী বা মানুষের সঙ্গী ছিল না। ধর্মীয় বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবন এবং সংস্কৃতির সঙ্গেও প্রাণীটির গভীর সম্পর্ক ছিল।

মিশরীয়দের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেবী ছিলেন বাস্তেত (Bastet)। তাঁকে সাধারণত বিড়ালের মাথাবিশিষ্ট নারী অথবা বিড়ালের অবয়বে উপস্থাপন করা হতো।

বাস্তেত ছিলেন সুরক্ষা, মাতৃত্ব, পরিবার এবং গৃহস্থালির কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত এক দেবী। ফলে বিড়ালও ধীরে ধীরে মিশরীয় সমাজে বিশেষ ধর্মীয় মর্যাদা লাভ করে।

বাড়িতে বিড়াল পালন শুধু একটি শখের বিষয় ছিল না; অনেকের কাছে এটি ছিল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের অংশ।

এ কারণেই বিড়ালের মৃত্যু পরিবারের সদস্যদের কাছে গভীর আবেগের বিষয় হয়ে উঠতে পারত।

ভ্রু কামিয়ে শোক প্রকাশের কথা কোথা থেকে জানা যায়?

এই ঐতিহাসিক প্রথার অন্যতম প্রাচীন লিখিত বিবরণ দিয়েছেন হেরোডোটাস।

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে মিশর ভ্রমণকারী এই ইতিহাসবিদ তাঁর Histories গ্রন্থে মিশরীয়দের বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির বর্ণনা দিয়েছেন।

তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, কোনো বাড়িতে স্বাভাবিকভাবে একটি বিড়াল মারা গেলে সেই বাড়ির বাসিন্দারা শুধু নিজেদের ভ্রু কামিয়ে ফেলতেন।

অন্যদিকে, বাড়িতে কোনো কুকুর মারা গেলে পরিবারের সদস্যরা মাথা ও পুরো শরীরের লোম কামিয়ে ফেলতেন।

এই পার্থক্য থেকেই বোঝা যায়, প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে বিভিন্ন প্রাণীর সামাজিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব কতটা আলাদা ছিল।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি হেরোডোটাসের বর্ণিত একটি ঐতিহাসিক রীতি। তাঁর বিবরণকে প্রাচীন মিশরের প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি সময়ের জন্য একইভাবে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

ভ্রু আবার গজানো পর্যন্ত কি চলত শোক?

এই প্রথা নিয়ে প্রচলিত অনেক বর্ণনায় বলা হয়, ভ্রু আবার গজিয়ে ওঠা পর্যন্ত শোক চলত।

বিষয়টি শুনতে বেশ চমকপ্রদ। তবে হেরোডোটাসের মূল বিবরণে শোকের নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ভ্রু গজানো পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা উল্লেখ নেই।

তাই এই অংশটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে প্রচলিত একটি অতিরিক্ত বিবরণ হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।

বিড়াল মারা গেলে তাদের কী করা হতো?

প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে বিড়ালের গুরুত্ব শুধু জীবিত অবস্থাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মৃত্যুর পরও তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হতো।

হেরোডোটাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত বিড়ালদের মমি তৈরি করে পবিত্র স্থানে সমাহিত করা হতো। বিশেষ করে বুবাস্তিস (Bubastis) শহর ছিল বিড়াল-সংক্রান্ত ধর্মীয় উপাসনা ও সমাধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারেও প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক বিড়ালের মমি ও সমাধির সন্ধান পাওয়া গেছে।

এগুলো প্রমাণ করে যে, মিশরীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বিড়ালের অবস্থান ছিল অত্যন্ত বিশেষ।

মাথার চুল কামানো এবং কৃত্রিম উইগের ব্যবহার

প্রাচীন মিশরীয়দের সৌন্দর্যচর্চা ও পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসও ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়।

বিশেষ করে ধর্মীয় পুরোহিতদের নিয়মিত মাথা ও শরীরের লোম কামানোর কথা হেরোডোটাস উল্লেখ করেছেন। পরিচ্ছন্নতা এবং উকুনের মতো পরজীবী থেকে দূরে থাকার বিষয়টি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে, প্রাচীন মিশরে কৃত্রিম চুল বা উইগ ব্যবহারেরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষণাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, নারী-পুরুষ উভয়েই বিভিন্ন সময়ে উইগ ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে অভিজাত শ্রেণির মধ্যে এটি ছিল সৌন্দর্য, সামাজিক অবস্থান এবং ফ্যাশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উইগের ব্যবহার শুধু সাজসজ্জার জন্যই ছিল না। মাথার ত্বককে সরাসরি রোদ থেকে রক্ষা করা এবং মাথার উকুন নিয়ন্ত্রণেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।

অর্থাৎ, প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনযাত্রায় ধর্মীয় বিশ্বাস, সৌন্দর্যচর্চা এবং ব্যবহারিক প্রয়োজন একসঙ্গে কাজ করত।

ইতিহাসের এই অদ্ভুত রীতি আমাদের কী শেখায়?

প্রাচীন মিশরের বিড়াল-সংক্রান্ত শোক পালনের রীতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি সভ্যতার নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আবেগ প্রকাশের পদ্ধতি থাকে।

আজ আমাদের কাছে ভ্রু কামিয়ে শোক প্রকাশ করা অস্বাভাবিক মনে হলেও, প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে এটি ছিল একটি স্বীকৃত শোক প্রকাশের রীতি বলে হেরোডোটাসের বিবরণে উঠে এসেছে।

বিড়ালের মমি, দেবী বাস্তেতের উপাসনা এবং বিড়ালের মৃত্যুকে ঘিরে শোকের এই প্রথা—সবকিছু মিলিয়ে বোঝা যায়, প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনে প্রাণীদের অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ইতিহাসের এমন ছোট ছোট ঘটনাই আমাদের অতীতের মানুষদের চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে নতুন করে জানতে সাহায্য করে।

আপনার কাছে কি প্রাচীন মিশরের এই শোক পালনের রীতিটি অদ্ভুত মনে হয়েছে? ইতিহাসের এমন আরও বিস্ময়কর ও অজানা ঘটনা জানতে The Reverse Times-এর সঙ্গে থাকুন।

আপনার মতামত

লাইক ০ সেভ করুন ★★★★★ এখনো রেটিং নেই

মন্তব্য ০

  1. এখনো কোনো মন্তব্য নেই।

History, Delivered
Monthly

Join 240,000 readers who receive deeply researched essays, archival discoveries, and long-form narratives about the past that illuminate the present.