অপরাধের শিকড়
অমীমাংসিত রহস্য
ইতিহাস
ইতিহাসে আজ
উদ্ভাবন ও আবিষ্কার
ঐতিহাসিক ঘটনা
ঐতিহাসিক স্থান
ঐতিহাসিক ছবি
কালের বিবর্তন
খাদ্যের ইতিহাস
খেলাধুলার ইতিহাস
ব্যক্তিত্ব
জীবনধারা
নামকরণের ইতিহাস
পৌরাণিক কাহিনি
শিল্প ও বিপ্লব
ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
মহাকাশ ইতিহাস
রাজা ও রাজ্য
শিক্ষা ও জ্ঞান
স্মরণীয় দিন
সাম্প্রতিক ইতিহাস
ঐতিহাসিক স্থান  ·  মুঘল আমল

লালবাগ কেল্লা: যে দুর্গ কখনো শেষ হয়নি

যে দুর্গ একটি মৃত্যুর পর কখনো শেষ হয়নি

By Admin · · min read
লালবাগ কেল্লা: যে দুর্গ কখনো শেষ হয়নি - The Reverse Times Bangladesh History Magazine

পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি, রিকশার ঘণ্টা আর দোকানের কোলাহল পেরিয়ে হঠাৎ এক বিশাল লাল ফটক। ভেতরে ঢুকলেই সময় যেন থমকে যায়—সবুজ বাগান, জলের নালা, আর তিনটি নিঃশব্দ মুঘল স্থাপনা। এটি লালবাগ কেল্লা: ঢাকার সবচেয়ে পরিচিত মুঘল নিদর্শন, এবং একই সঙ্গে ইতিহাসের এক অসমাপ্ত বাক্য। সাড়ে তিনশো বছর আগে যে দুর্গের কাজ শুরু হয়েছিল, তা আজও শেষ হয়নি।

এক শাহজাদার স্বপ্ন: "কিল্লা আওরঙ্গাবাদ"

১৬৭৮ সাল। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম তখন বাংলার সুবাদার। তখন ঢাকা ছিল সুবা বাংলার রাজধানী—নদীপথে বাণিজ্য, মসলিন আর রাজস্বে সমৃদ্ধ এক শহর। বুড়িগঙ্গার তীরে, শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে শাহজাদা একটি সুরক্ষিত প্রাসাদ-দুর্গের কাজ শুরু করেন। পিতার নামে এর নাম রাখা হয় কিল্লা আওরঙ্গাবাদ—আওরঙ্গাবাদের দুর্গ।

কিন্তু শাহজাদার বাংলায় থাকা হয়েছিল মাত্র প্রায় পনেরো মাস। দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সম্রাট তাঁকে ফিরিয়ে নেন। দুর্গের কাজ তখনও অর্ধেকও এগোয়নি।

শায়েস্তা খান ও পরী বিবি

আজমের পর আবারও বাংলার সুবাদার হয়ে আসেন নবাব শায়েস্তা খান—সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের ভাই, অর্থাৎ আওরঙ্গজেবের মামা। ঢাকার ইতিহাসে তাঁর শাসনকাল কিংবদন্তি হয়ে আছে; জনশ্রুতি আছে, তাঁর সময়ে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। শায়েস্তা খান দুর্গের কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলেন।

শায়েস্তা খানের কন্যা ইরান দুখত রহমত বানু, যিনি ইতিহাসে পরী বিবি নামে পরিচিত, বাগদত্তা ছিলেন শাহজাদা আজমের। কিন্তু বিয়ের আগেই, অকালে, এই দুর্গেই তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলাপিডিয়াসহ অধিকাংশ সূত্রে মৃত্যুর সাল ১৬৮৪ বলা হয়, যদিও কিছু সূত্রে ১৬৭৮-এর উল্লেখও পাওয়া যায়।

প্রিয় কন্যার মৃত্যুতে শোকাহত শায়েস্তা খান দুর্গটিকে অশুভ বলে মনে করতে শুরু করেন। নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়—আর কখনো শুরু হয়নি। দুর্গের ঠিক মাঝখানে তিনি মেয়ের জন্য গড়ে তোলেন একটি সমাধিসৌধ। একটি দুর্গ এভাবেই হয়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ।

কেল্লার ভেতরে কী আছে

দীর্ঘদিন ধরে লালবাগ কেল্লা বলতে বোঝানো হতো তিনটি ভবন, দুটি ফটক আর ভাঙাচোরা প্রাচীরের কিছু অংশ। তিনটি প্রধান স্থাপনা একই সারিতে দাঁড়িয়ে আছে, যদিও সমান দূরত্বে নয়:

১. পরী বিবির সমাধি

কেল্লার কেন্দ্রে, সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ভবন। মাঝের একটি বর্গাকার কক্ষ ঘিরে আছে আটটি কক্ষ; মাঝের কক্ষেই পরী বিবির কবর। এর ওপরে রয়েছে তামা বা পিতলের পাতে মোড়া আটকোনা একটি গম্বুজ। সমাধির ভেতরে ব্যবহৃত হয়েছে সাদা মার্বেল, কালো ব্যাসল্ট ও রঙিন টালি—যার অনেকটাই আনা হয়েছিল দূর থেকে। দক্ষিণ-পূর্ব কোণের কক্ষে আরেকটি ছোট কবর আছে, যা জনশ্রুতিতে শামসাদ বেগমের বলে পরিচিত।

২. দেওয়ান-ই-আম (দরবার হল) ও হাম্মামখানা

পূর্ব দিকের দোতলা ভবনটি ছিল সুবাদারের বাসভবন ও দরবার। এর সঙ্গে যুক্ত মুঘল রীতির হাম্মাম বা স্নানাগার—গরম ও ঠান্ডা পানির ব্যবস্থাসহ। ভবনটি এখন জাদুঘর, যেখানে মুঘল আমলের মুদ্রা, অস্ত্রশস্ত্র, পাণ্ডুলিপি, চিত্রকর্ম ও গালিচা প্রদর্শিত হয়। খননে হাম্মাম ও সমাধির মাঝে একটি পোড়ামাটির পাইপলাইনও পাওয়া গেছে—একটি পাইপের ভেতর আরেকটি পাইপ বসানো, মুঘল প্রকৌশলের চমৎকার নিদর্শন।

৩. কেল্লা মসজিদ

পশ্চিম প্রান্তে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি শাহজাদা আজমের আমলেই নির্মিত। সাড়ে তিনশো বছর পরও এখানে নিয়মিত নামাজ হয়।

পুরো চত্বর সাজানো হয়েছিল মুঘল চারবাগ রীতিতে—জলের নালা আর ফোয়ারা দিয়ে বাগানকে ভাগ করে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে দেখা গেছে, মূল দুর্গপ্রাচীর বর্তমান শায়েস্তা খান রোড পেরিয়ে আরও পূর্ব দিকে বিস্তৃত ছিল। অর্থাৎ আজ আমরা যে কেল্লা দেখি, তা সম্ভবত শাহজাদা আজমের মূল পরিকল্পনার অর্ধেক মাত্র।

পরিত্যক্ত দুর্গ থেকে "লালবাগ"

শায়েস্তা খান ১৬৮৮ সালে ঢাকা ছাড়েন। এরপর কয়েক দশকের মধ্যে সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরে যায়, আর কেল্লাটি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়। ১৭৮৭ সালে ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী জোহান জোফানি কেল্লার দক্ষিণ ফটকের যে ছবি আঁকেন, তাতে দেখা যায় এক নির্জন, জীর্ণ স্থাপনা। ১৮৪৪ সালের দিকে এলাকাটি "আওরঙ্গাবাদ"-এর বদলে "লালবাগ" নামে পরিচিত হয়ে ওঠে, আর দুর্গটির নামও হয়ে যায় লালবাগ কেল্লা।

১৮৫৭: বিদ্রোহের রক্ত

লালবাগ কেল্লার ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায় ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ। তখন কেল্লায় অবস্থান করছিল ব্রিটিশ বাহিনীর দেশীয় সিপাহিরা। ২২ নভেম্বর ১৮৫৭ ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের নিরস্ত্র করতে এলে সংঘর্ষ বাধে। বিদ্রোহী সিপাহিরা পরাজিত হয়; অনেকে নিহত হন, বন্দিদের পরে শাস্তি দেওয়া হয়। জনশ্রুতি আছে, ধৃত বিদ্রোহীদের আজকের বাহাদুর শাহ পার্কে (তৎকালীন আন্টাঘর ময়দান) গাছে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।

সুড়ঙ্গের রহস্য

লালবাগ কেল্লা নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে গল্প ঘোরে, তা হলো এর গোপন সুড়ঙ্গ। লোকমুখে শোনা যায়, কেল্লার নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ চলে গেছে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত, এমনকি জিঞ্জিরা প্রাসাদ পর্যন্ত। আরও শোনা যায়, ১৮৫৭ সালে দুই পক্ষের সৈন্যরাই সুড়ঙ্গে ঢুকে আর কখনো ফিরে আসেনি। এসব গল্পের পক্ষে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি; তবে এগুলোই কেল্লার রহস্যময় আবহকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।

আজকের লালবাগ কেল্লা

বর্তমানে লালবাগ কেল্লা বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। চারপাশে উঁচু ভবন আর ব্যস্ত সড়ক থাকলেও প্রাচীরের ভেতরে এখনো এক শান্ত মুঘল বাগান। সন্ধ্যায় আলোকসজ্জায় পরী বিবির সমাধির গম্বুজ যখন জ্বলে ওঠে, তখন বোঝা যায়—এই কেল্লা যুদ্ধ জেতার জন্য টিকে থাকেনি, টিকে আছে এক বাবার শোকের স্মারক হয়ে।

একটি দুর্গ যা কখনো শেষ হয়নি, একটি বিয়ে যা কখনো হয়নি, আর একটি নাম যা বদলে গেছে—লালবাগ কেল্লা আসলে অসমাপ্ত গল্পেরই এক স্থাপত্য।

ঘুরতে যাওয়ার আগে জেনে নিন

  • অবস্থান: লালবাগ, পুরান ঢাকা (বুড়িগঙ্গার কাছে)
  • যাতায়াত: গুলিস্তান, শাহবাগ বা কার্জন হল থেকে রিকশা বা সিএনজিতে সহজে যাওয়া যায়
  • পরামর্শ: সাপ্তাহিক বন্ধের দিন ও প্রবেশমূল্য যাওয়ার আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেখে নিন

তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া (লালবাগ দুর্গ, বিবি পরী); Archnet; বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

History, Delivered
Monthly

Join 240,000 readers who receive deeply researched essays, archival discoveries, and long-form narratives about the past that illuminate the present.