১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে একটি যুদ্ধ হলো, যা সামরিক দিক থেকে খুব বড় কিছু ছিল না। কিন্তু এর ফলাফল বদলে দিল উপমহাদেশের ইতিহাস। যে বাংলা একসময় বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি ছিল, তার ভাগ্য সেদিন থেকেই ধীরে ধীরে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যেতে শুরু করে।
বাংলার নবাব ও কোম্পানির লোভ
১৭৫৬ সালের এপ্রিলে নানা আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে বসেন। তখন তাঁর বয়স ছিল অল্প। প্রাসাদের ভেতরে ছিল আত্মীয়দের ক্ষমতার লড়াই, সেনাপতিদের অসন্তোষ, আর বাইরে ছিল ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইংরেজ কোম্পানি।
কোম্পানি নবাবের অনুমতি ছাড়াই কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করছিল। তারা বাণিজ্য-সুবিধার অপব্যবহার করছিল এবং নবাবের বিরোধীদের আশ্রয় দিচ্ছিল। সিরাজ এসব মেনে নেননি। ১৭৫৬ সালের জুনে তিনি কলকাতা দখল করেন।
কালকুঠুরি: একটি বিতর্কিত কাহিনি
কলকাতা দখলের পর ইংরেজ বন্দিদের একটি ছোট কক্ষে রাখা হয় এবং অনেকে মারা যান, এমন একটি বিবরণ ইউরোপে "ব্ল্যাক হোল ট্র্যাজেডি" নামে ছড়িয়ে পড়ে। তবে মৃতের সংখ্যা ও ঘটনার বিবরণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ আছে। অনেকে মনে করেন, বিবরণটি অতিরঞ্জিত।
ষড়যন্ত্রের জাল
এরপর রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজরা কলকাতা পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল আরও বড়: নবাবকে সরিয়ে একজন অনুগত পুতুল বসানো।
এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত হন সিরাজের সেনাপতি মীর জাফর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রভাবশালী ব্যাংকার জগৎ শেঠ এবং আরও কয়েকজন দরবারি ও বণিক। মীর জাফরকে নবাব বানানোর প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে কোম্পানি পাবে বিপুল অর্থ ও বাণিজ্যিক সুবিধা।
২৩ জুন ১৭৫৭: যুদ্ধের দিন
পলাশীর প্রান্তরে সিরাজের বাহিনী ছিল সংখ্যায় বিশাল, ইংরেজদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। ক্লাইভের অধীনে ছিল আনুমানিক তিন হাজার সৈন্য, তার মধ্যে ইউরোপীয় ও এ দেশীয় সিপাহি উভয়ই ছিল।
কিন্তু সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও নবাবের বাহিনীর বড় অংশের সেনাপতিরা আগে থেকেই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। আগের দিন বৃষ্টিতে নবাবের কামানের বারুদ ভিজে যাওয়ার কথাও বলা হয়। নবাবের অনুগত সেনাপতি মীর মদন ও মোহনলাল সাহসের সঙ্গে লড়লেন। মীর মদন নিহত হলেন। কিন্তু মীর জাফরের বাহিনী নিষ্ক্রিয় থেকে গেল।
দুপুরের মধ্যেই লড়াইয়ের মোড় ঘুরে গেল। সিরাজ রণক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। ইংরেজদের ক্ষয়ক্ষতি ছিল সামান্য, আর নবাবের পক্ষে ক্ষতি হলো বেশি।
সিরাজের পরিণতি
পালিয়ে যাওয়ার পর সিরাজউদ্দৌলা ধরা পড়েন। ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই মুর্শিদাবাদে মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয়। মীর জাফর নবাব হলেন, কিন্তু আসল ক্ষমতা ততদিনে কোম্পানির হাতে।
পলাশীর পর
পলাশীর পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলার রাজকোষ থেকে বিপুল সম্পদ কোম্পানির হাতে যেতে থাকে। ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের পর ১৭৬৫ সালে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে, অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের অধিকার। এভাবে ব্যবসায়ী কোম্পানি ধীরে ধীরে শাসকে পরিণত হয়।
বর্তমানের সঙ্গে সংযোগ
পলাশীর শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র শুধু বাইরের শত্রুতে নয়, ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব আর অনৈক্যেও ভেঙে পড়তে পারে। ইতিহাসবিদরা তাই পলাশীকে প্রায়ই "যুদ্ধ" নয়, বরং "ষড়যন্ত্রের পরিণতি" বলে বর্ণনা করেন।
মন্তব্য ০