অপরাধের শিকড়
অমীমাংসিত রহস্য
ইতিহাস
ইতিহাসে আজ
উদ্ভাবন ও আবিষ্কার
ঐতিহাসিক ঘটনা
ঐতিহাসিক স্থান
ঐতিহাসিক ছবি
কালের বিবর্তন
খাদ্যের ইতিহাস
খেলাধুলার ইতিহাস
ব্যক্তিত্ব
জীবনধারা
নামকরণের ইতিহাস
পৌরাণিক কাহিনি
শিল্প ও বিপ্লব
ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ
মহাকাশ ইতিহাস
রাজা ও রাজ্য
শিক্ষা ও জ্ঞান
স্মরণীয় দিন
সাম্প্রতিক ইতিহাস
ইতিহাস

এক টাকায় আট মণ চাল, মসলিন আর বুড়িগঙ্গার সোনালি সময়

শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকা

By Admin · November 4, 2026 · 4 min read
এক টাকায় আট মণ চাল, মসলিন আর বুড়িগঙ্গার সোনালি সময় - The Reverse Times Bangladesh History Magazine

সারসংক্ষেপঃ

শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকা মুঘল বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৬৬৪ সালে বাংলার সুবেদার হওয়ার পর তিনি উপকূলীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, চট্টগ্রাম বিজয় এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনামলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘এক টাকায় আট মণ চাল’, বিশ্বখ্যাত ঢাকার মসলিন, বুড়িগঙ্গার নদীবাণিজ্য এবং লালবাগ দুর্গের ইতিহাস।

শায়েস্তা খানের ঢাকা: এক টাকায় আট মণ চালের গল্প

এক টাকায় আট মণ চাল! আজকের দিনে কথাটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও মুঘল বাংলার ইতিহাসে এটি শায়েস্তা খানের শাসনামলের সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

একবার কল্পনা করুন, আজকের ব্যস্ত ঢাকা তখনো গড়ে ওঠেনি। নেই যানজট, উঁচু দালান কিংবা আধুনিক শহরের কোলাহল। শহরের প্রাণ ছিল বুড়িগঙ্গা নদী। নদীর বুকে শত শত নৌকা ভেসে বেড়াত। কোনো নৌকায় চাল, কোনো নৌকায় মসলা, আবার কোনো নৌকায় থাকত দূরদেশ থেকে আসা বণিক।

তখন ঢাকার নাম ছিল জাহাঙ্গীরনগর। ১৬১০ সালে ইসলাম খান চিশতি বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করার পর শহরটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে।

শায়েস্তা খানের আগমন ও চট্টগ্রাম বিজয়

১৬৬৪ সালে শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে আরাকানি আক্রমণ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের উৎপাত বাণিজ্যের জন্য বড় বাধা ছিল।

শায়েস্তা খান উপকূলীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ১৬৬৬ সালে মুঘল বাহিনী চট্টগ্রাম দখল করে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মুঘলদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়।

ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান এই সময় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদীপথের মাধ্যমে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা থাকায় শহরটি দ্রুত বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়।

বুড়িগঙ্গা ও ঢাকার বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি

মুঘল আমলে বুড়িগঙ্গা ছিল ঢাকার অর্থনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তখন নদীই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

নৌকায় করে আসত চাল, মসলা, বস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য। নদীর ঘাটে গড়ে উঠেছিল বাজার, গুদাম এবং ব্যবসাকেন্দ্র।

এই নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ঢাকা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের মিলনস্থলে পরিণত হয়।

ঢাকার মসলিন: বাংলার বিশ্বখ্যাত সম্পদ

শায়েস্তা খানের সময় ঢাকার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি ছিল মসলিন।

ঢাকার দক্ষ তাঁতিদের হাতে তৈরি এই সূক্ষ্ম কাপড়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে। দূরদেশের বণিকরা মসলিন ও অন্যান্য বস্ত্র সংগ্রহের জন্য বাংলায় আসতেন।

ডাচ, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকদের আগমন ঢাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তোলে।

শায়েস্তা খানের সময়ের স্থাপত্য

ঢাকার সমৃদ্ধি শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মুঘল স্থাপত্যের বিভিন্ন নিদর্শনও শহরটির পরিচয় গড়ে তুলেছিল।

ছোট কাটরা

পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো ছোট কাটরা। এর স্থাপত্যে মুঘল আমলের নির্মাণশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায়।

লালবাগ দুর্গ

১৬৭৮ সালে যুবরাজ মুহাম্মদ আজম দুর্গটির নির্মাণ শুরু করেন। পরে শায়েস্তা খান এর সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর দুর্গটির নির্মাণকাজ অসমাপ্ত থেকে যায়। দুর্গের ভেতরে তাঁর সমাধি নির্মিত হয়।

আজও লালবাগ দুর্গ ঢাকার মুঘল ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

এক টাকায় আট মণ চাল: কতটা বাস্তব?

শায়েস্তা খানের নামের সঙ্গে ‘এক টাকায় আট মণ চাল’ কথাটি ঐতিহাসিকভাবে প্রচলিত।

এটি সেই সময়ের কম খাদ্যদামের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। তবে চালের দাম কম ছিল মানেই প্রত্যেক মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ছিলেন, এমনটা বলা যায় না।

কৃষি উৎপাদন, খাদ্যের সরবরাহ, মানুষের আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা— সবকিছু মিলিয়েই একটি সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থা নির্ধারিত হয়।

তাই এই প্রচলিত কথাটিকে শায়েস্তা খানের আমলের সমৃদ্ধির একটি ঐতিহাসিক প্রতীক হিসেবে দেখা উচিত।

শায়েস্তা খানের বিদায় ও ঢাকার ইতিহাস

১৬৮৮ সালে শায়েস্তা খান শেষবারের মতো ঢাকা ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর শাসনামলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক ইতিহাস ঢাকার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকে।

বুড়িগঙ্গার নদীপথ, মসলিন শিল্প, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য— সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা তখন মুঘল বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়েছিল।

আজকের আধুনিক ঢাকার পেছনে রয়েছে সেই পুরনো জাহাঙ্গীরনগরের ইতিহাস।

শায়েস্তা খানের ঢাকা মানে শুধু এক টাকায় আট মণ চাল নয়। এটি একটি নদীকেন্দ্রিক শহরের উত্থান, বাংলার মসলিন শিল্পের আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং মুঘল আমলের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির গল্প।

আর এই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও বয়ে চলেছে বুড়িগঙ্গা।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. শায়েস্তা খান কত সালে বাংলার সুবেদার হন?

১৬৬৪ সালে শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২. শায়েস্তা খানের আমলে এক টাকায় কত মণ চাল পাওয়া যেত?

প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত।

৩. মুঘল আমলে ঢাকার নাম কী ছিল?

সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে ঢাকার নাম ছিল জাহাঙ্গীরনগর।

৪. চট্টগ্রাম কখন মুঘলদের দখলে আসে?

১৬৬৬ সালে মুঘল বাহিনী চট্টগ্রাম দখল করে।

৫. লালবাগ দুর্গ কে নির্মাণ শুরু করেন?

১৬৭৮ সালে যুবরাজ মুহাম্মদ আজম লালবাগ দুর্গের নির্মাণ শুরু করেন।

৬. শায়েস্তা খানের সময় ঢাকার প্রধান বাণিজ্যিক সম্পদ কী ছিল?

ঢাকার মসলিন, বস্ত্রশিল্প এবং নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্য ছিল শহরটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উপসংহার

শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকা ছিল নদী, বাণিজ্য, মসলিন ও মুঘল স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এক টাকায় আট মণ চালের গল্প সেই সময়ের সমৃদ্ধির প্রতীক হলেও ঢাকার প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব লুকিয়ে আছে তার নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ইতিহাসে। আর সেই গল্পের সবচেয়ে নীরব সাক্ষী আজও বুড়িগঙ্গা।

আপনার মতামত

লাইক ০ সেভ করুন ★★★★★ এখনো রেটিং নেই

মন্তব্য ০

  1. এখনো কোনো মন্তব্য নেই।

History, Delivered
Monthly

Join 240,000 readers who receive deeply researched essays, archival discoveries, and long-form narratives about the past that illuminate the present.